ভ্ুধীরঞ্ন মুখোপাধ্যায়

কথাকলি পঞ্চানন ঘোষ লেন, কলিকাতা

প্রথম সংস্করণ £ নভেম্বর ১৯৬০

প্রকাশক £ প্রকাশচন্দ্র সিংহ

পঞ্চানন ঘোষ লেন কলিকাতা

মুদ্রক,

জিতেন্্র নাথ বস্ু

দি প্রিপ্ট ইণ্ডিয়।

৩।১ মোহনবাগান লেন কলিকাতা

প্রচ্ছণ £ পূর্ণেন্দু পত্রী

প্রচ্ছদ মুন্রণ ফাইন প্রিন্টার্স প্রাইভেট লিঃ

পরিবেশক £

জ্রিবেণী প্রকাশন প্রাইভেট লিঃ স্তামাচরণ দে স্রশাট কলিকাতা ১২

দাম £ চার টাকা

প্রায় পঁচিশ বছর আগে আমার কৈশোরের প্রথম-প্রথম ষাকে আমিই প্রথম আধুনিক বাংলার শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী বলে প্রণাম করেছিলাম

ভারাশহ্কর বন্দ্যোপাধ্যাক়্ শ্রীচরণেষু

রচনাকাল এপ্রিল--নভেম্বর £ ১৯৬০ পুরী £ কলকাতা

এক

আজ বাড়িতে আমার শেষ রাত !

আমার ঘুম আসবে না। একটি একটি করে সব আলো নিভে গেছে কেউ জেগে নেই। মধ্যরাত্রির ছুঃসহ চঞ্চলতা আমাকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে আসে

আমি জেগে থাকব

আমার জন্তে জ্যোৎস্সার রুপালি রেখায় রেখায় কাপছে কঠিন সঙ্গীত রাগের মতো মধুময় এক জাগরণ ! হাওয়ার কম্পমান তরঙ্গে ভেসে আসা লোকাতীত অনুরণন আমাকে জাগিয়ে রাখে |

আমার চোখের তারায় তারায় থরোথরো মহাজীবন ! হে রাজপুত্র! আমি তোমার শরণ নিলাম !

সে-রাজ প্রাসাদ স্ুৃপ্রির ক্লান্তিতে নিঝুম রাজকীয় আভম্বর তোমাকে কাধতে পারবে না! শান্ত মন্থর চরণধ্বনি আলোর কণিকা জড়িয়ে জড়িয়ে নিবিড় আনন্দের গহনলোকে মিলিয়ে যাবে

গোপা! তুমি ঘুমোও

মা! তুমি ঘুমোও !

বাবা! "তুমি ঘুমোও !

কিন্তু আমি আজ সারা রাত জেগে থাকব জাগরণের কী বিপুল আনন্দ! প্রাসাদ লুপ্ত হয়ে যাক। এম্বর্ষের কঠিন শৃঙ্খল শিথিল হয়ে যাক আমার হৃদয়ে আনন্দের বান। আমার নয়নে আনন্দলোক আমার শ্রবণে শাস্ত মন্থর চরণধবনি !

হে রাজপুত্র! আমি তোমার শরণ নিলাম !

হে মহাঁজীবন! আমি তোমার শরণ নিলাম !

ছুই

এই কলকাতাকেই সেদিন আমি অন্য চোখে দেখেছিলাম

যেন প্রথম দেখলাম ওয়েলিংটন ক্কোয়ারে তখন অনেক আলো জ্বলে উঠেছে। সাদা সাদা রঙ করা বড় বড় তালগাছগুলে। হঠাৎ চঞ্চল হয়ে সন সন শব্দ করছে আর একটু এগিয়ে পুলিসের হাতের ইশারায় এক-একটা1 মোটর থমকে দ্াড়াচ্ছে

রাস্তায় নেমে আমরাও যেন থমকে দীড়িয়ে পড়লাম

আমরা মানে সনতের তিন বন্ধু, সনৎ আর আমি আজ থেকে আমি সনতের জ্ত্রী। এখন আমার নাম শ্রীমতী মুখাঁজি নয়-_ শ্রীমতী সিংহ 'একটু আগে সামনের ওই পুরনো বড় বাড়িটার দোতলার ছোট একটা ঘরে কয়েক মিনিটের মধ্যে আমাদের বিয়ে হয়ে গেল একটা মোটা খাতায় বর কনে আর সাক্ষীদের শুধু কয়েকটা সই।

আপনারা বিশ্বাস করুন, এক মুহুর্তের জন্তেও আমার বুকের কাপন দ্র হয় নি। জামান্য উত্তেজনার কোন শিহর আমি অনুভব করিনি। ঠিক বিকেল পাঁচটায় প্রথম বৈশাখের প্রথর রোদে প্রৌঢ় ম্যারেজ অফিসারের নির্দেশমত আমি ছু-একটা সই করে দিলাম

আমার পুর্ব পরিচয় লুপ্ত হয়ে গেল এখন আমি নতুন সংসারের মানুষ সনতের বন্ধুরা আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে সেই কথাটা হালকা সুরে শুনিয়ে দিল

হাঁসির মুদছ্ একট ঝলক দেয়া ছাড়া তখন আমার আর কিছু করবার ছিল না। অনেকদিন থেকেই আমি জানতাম আজকের এই ব্যাপারটা এমনি সহজ রূপ নিয়ে আমার কাছে গভীর হয়ে উঠবে আমি ইচ্ছে করেই সনংকে বেছে নিয়েছি

ব্যাপারটা আমার কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও, আমার

মা-বাবার কাছে শুধু অস্বাভাবিক নয়, ভয়ঙ্কর রকম অপমানকর মনে হয়েছে।

অসবর্ণ বিবাহ বলে নয়, আমার মা-বাবা ওসব তুচ্ছ কারণ নিয়ে মাথা ঘামান না আমি যদি সনৎ সিংহকে বিবাহ না করে অন্য কারুর সঙ্গে নিজের জীবন জড়িয়ে ফেলতাম--আর সে যদি এমন মানুষ হত যে আমার বাবার মত অতবড় চাঁকরি না করলেও মা-বাবার দৃষ্টিতে ভদ্ররকমের কোন চাকরি করে আর যার সংসারের মানুষরা আমাদের বাড়ির ধরনেই চলাফেরা করে, তাহলে আমার বুদ্ধি আর বিচারের ওপর ম৷ বারবার অমন কঠোর উক্তি করতেন না।

কিন্ত মা কথাও জানতেন যে আমাকে বাধা দেবার কোন ক্ষমত| তার নেই। আর সনতের বেলায় তিনি যেন নিজের জালে নিজেই জড়িয়ে পড়লেন। আমাকে উপলক্ষ করে আর পাঁচজন আমার মার আসল রূপটা দেখে ফেলল

ক্কিস্ত আশ্চর্য, এখন মার কোন লজ্জা নেই ছুদিন আগে যে সনতের তিনি উচ্ছৃুসিত প্রশংসা করতেন_-আমার সঙ্গে মধুর একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছে শুনেই তীর মুখটা কঠিন হয়ে উঠল

আমি মাকে কিছু বলিনি। কোনদিন বলতামও নাঁ। মা-র সঙ্গে যেন আমার ঈর্ধার সম্পর্ক। আমি মাকে স্বীকার করতে পারতাম না বলে আমার ওপর তার ভয়ঙ্কর একটা আক্রোশ ছিল

স্বীকার করবার কথাটা আপনাদের আরও স্পষ্ট করে বলি। মা হিসেবে তীঁকে মানি বা না-মানি, তাতে তার কিছু যায় আসে না। তিনি যে আমার মা, সে-কথাটা তো কোনমতেই অস্বীকার করবার উপায় নেই।

কিন্তু মা-র সাহিত্যিক সত্তা কখনও আমার মনে কোন রেখাপাত করেনি বলেই আমার ওপর তার যত আক্রোশ কেন রেখাপাত করেনি সে-কথাও আমি একে একে আপনাদের শোনাব

আমি জানি না, আমার কাহিনী আপনাদের মনে কৌতুহল

জাঁগাবে কিনা কিন্তু এই আমার প্রথম শেষ লেখা এটা উপন্যাস না জীবনী, বড় গল্প 'না রম্যরচনা--তা আমি নিজেই জানি না বলে আপনাদেরও জানাতে পারলাম না

আপনার। এর যা খুশি একটা নাম দিন

শুনেছি নিজের জীবনের যে-কোন ঘটনার কথা লিখলেই তা সাহিত্য হয়ে ওঠে না ফটোগ্রাফ হয়, কিন্তু শিল্পার আকা! ছবি হয় না। লেখকের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে কল্পনার গাঢ় রঙ ন। মিশলে রসঘন কাহিনী ফুটিয়ে তোলাও নাকি সম্ভব নয়। পাতায় পাতায় অজন্ন কথার ফাঁকে ফাঁকে চাই নিপুণ কারুকাজ তা না হলে আজকের দিনে অসংখ্য গুণী লেখকের ভিড়ে আমার নাম পাঠক সাধারণের মনে কোন সাড়া জাগাবে না আমার লেখাটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে

তাযাক।

তাতে আমার এতটুকু ক্ষোভ থাকবে না। লেখিকা বলে বিখ্যাত হবার কোন মোহ আমার নেই |

একথা শুনে হয়তো আপনারা বলবেন, তাহলে লিখছ কেন? জানই যখন লিখে তোমার কিছু হবে না, তাহলে পাতার পর পাতা ভরিয়ে শুধু শুধু কেন সময় নষ্ট করলে?

কেন !

উত্তর একটা নিশ্চয়ই আমার মনে সাজানো আছে কিন্তু আপাতত সে-কথা আপনাদের জানাবার ইচ্ছে নেই শুধু এইটুকু বলে রাখি, মিথ্যার রঙ, কল্পনার তুলি আর ভাষার কারুকাজ সম্বল করে যে কাহিনী গড়ে ওঠে তার ওপর আমার নিজের খুব বেশি আস্থা নেই।

হোক অপটু হাতের অমাঞ্জিত রচনা, কিন্তু তাতে যদি জীবনের স্পন্দন শোনা যায় আর আবিষ্কার কর! যায় নির্মম এক সত্যকে গভীর সমবেদনার মধ্যে, তাহলে আমার মনে হয় সেই রচন! সাহিত্য

হিসেবে হয় তো সার্থক কিন্তু আবার বলছি, আমার লেখা সাহিত্য হয়েছে কিনা মে-বিচার আপনারা করবেন না। আর কিছু থাক বা না থাক, এর প্রত্যেকটি পাতা আমি শুধু আমার নিবিড় উপলব্ধি দিয়ে ভরে দিয়েছি

আর তাই আশ্চর্য এক প্রেরণার আভায় কাহিনী লেখবার সাহস পেলাম আপনাদের পড়তে ভাল লাগুক বা না লাগুক, লিখতে আমার ভাল লাগছে। সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা

আমার মা-র নাম সরমা আর বাবার নাম আদিনাথ আর কোন ভাই-বোন নেই। আমিই একমাত্র মেয়ে

বৃদ্ব-পূর্ণিমার রাতে আমার জন্ম হয়েছিল বলে আমার নাম গ্রীমতী নামটা আমার মা রেখেছিলেন

মে-কথাট! বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রায়ই আমাকে শোৌনাতেন অর্থাৎ আমার এই নাম রাখার পেছনে মা-র বিদ্যা বুদ্ধির প্রচ্ছন্ন একটা ইঙ্গিত আছে

এমন নাম নাকি সাধারণ মানুষের পক্ষে দেওয়া সম্ভব ছিল না। যেহেতু আমার মা লেখিকা আর তার অস্তদূর্টি সাধারণের চেয়ে অনেক বেশি গভীর, তাই বুদ্ধ-পুর্নিমার রাতে জন্মেছি বলে বুদ্ধের দাসীর অমন সুন্দর নাম তিনি আমার জঙ্কে ঠিক করতে পারলেন

আমার মা-র নাম হয়তে। আপনারা শোনেন নি। শোনবার কথাও নয়। কারণ তিনি ধাদের নিয়ে থাকেন আর যে-সব চরিত্র তার গল্প-উপন্যাসে ভিড় করে ধাড়ায়-আজকের দিনে সাহিত্যের দরবারে তাদের খুব বেশি মূল্য আছে বলে আমি মনে করি না।

তবু আমার মা লেখিকা সারা সকাল, সারা ছুপুর তিনি লেখেন লিখতে লিখতে তিনি গাছ দেখেন, পাখি দেখেন

আমাদের বাড়িতে অনেক গাছ। অনেক পাখি আমার মা বন-বাদাড় থেকে পাখি ধরে আনেন নি বটে, কিন্তু আমাদের বাড়ির বাগানে তিনি অনেক গাছ পুতেছেন আর গেটের কাছে লম্বা লক্বা তালগাছের গায়ে অনেক খরচ করে সাদা রঙ লাগিয়েছেন খুব সকালে ভোরের ভিজে আবছা! আলোয় দূর থেকে দেখলে মনে হয় সারা রাত ধরে গাছগুলোর ওপর অঝোর তুষার ঝরেছে।

ভোর থেকেই আমাদের বাড়িতে অনেক পাখি ডাকে দুর- দুরাস্ত থেকে মাঝে মাঝে নানা রডের অনেক পাখিও উড়ে আসে সাদার্ন আভিনিউ-এর ওপর বাড়ি হলেও তখন মনে হয় না যে কলকাতায় আছি একট! নকল পরিবেশ স্ষ্টি করে কলকাতায় অরণ্যের নির্জনতা নিয়ে আসার মূলে আমার মা

মা-র সাহিত্যিক প্রতিভাকে ফুটিয়ে তোলবার জন্তে বাবাকে অনেক কিছু সহা করতে হয়। কিন্তু তার জন্যে বাবা কখনও কিছু মনে করেন না। আমি অনেক সময় বুঝতে পারি না যতক্ষণ বাঝা বাড়িতে থাকেন ততক্ষণ তিনি কেন ভয়ে ভয়ে এপাশে-ওপাশে ঘোরাঘুরি কবেন। সকালবেল৷ মার সঙ্গে কথা বলবার তার সাহস হয় না। দরকার হলেও মা-র সামনে তার দাড়ানো বারণ

হ্যা, আমার মা-ই বারণ করে দিয়েছেন শুধু বাবাকে নয়__ আমাকেও

আমি কিন্তু অনেক সময় নিয়ম মানতাম না। তেমন প্রয়োজন হলে কোন কথ না ভেবে সোজা দোতজুা।র ঘোরানো বারান্দায় চলে এসে মা-র সঙ্গে কথা বলতাম তিনি বিরক্ত হচ্ছেন জেনেও আমার প্রয়োজন ন। ফুরেলে সেখান থেকে সরে আসতাম না

আমার বাবা একট বিলিতি কোম্পানির প্রায় সবময় কর্তা হাজার তিনেকের কাছাকাছি মাইনে পান। বেয়ারা বাবুচি মোটর আর আধুনিক সভ্যতার প্রয়োজনীয় য৷ কিছু জিনিস সবই আমাদের বাড়িতে আছে

আর সব ছাপিয়ে আছে একটা উগ্র বিলিতি গন্ধ-_যার ঝজে সব সময় আমি তীব্র অন্বস্তি অনুভব করতাম।

কিন্ত কেন করতাম ?

আমি বাড়িরই মেয়ে। আমার শৈশব থেকে যৌবনের প্রত্যেকটি দিন এখানেই কেটেছে আমার মা-বাবার মত মানুষ আমি অনেক দেখেছি আর যাদের সঙ্গে মিশেছি তারাও ঠিক আমাদেরই মত।

তাহলে কেন আমার এই সার! দিনরাতের অস্বস্তি?

আমার মনের কোথায় একট! অদ্ভুত নিরাসক্তি বাস! বেঁধে আছে। এশ্বয আর উগ্র আলোর অহঙ্কার সেখানে পৌছয় না। যখন আমার আশে-পাশে আর কেউ থাকে না, বাড়ির সব আলো একে একে নিভে যায়, হাওয়ায় মন্থর ঝিমঝিমানি ভেসে আসে বেহালার ছড়ে কাপা-কাপা কান্নার মত তখন আমার মনে হয় যেন স্কুল মিথ্যরে মাঝে আমি বাস করছি এখানে আমাকে মানায় না। এমন করে বেঁচে থাক। আমার সাজে না

আমার জন্মের সঙ্গে আমি যেন একটা কঠিন শর্ত বহন করে এনেছি। মুক্তির অদ্ভুত অলৌকিক এক শর্ত। আমি এমন করে বাচতে পারব না। প্রথম কৈশোরে অপরিণত ভাবনার ঢেউ আমাকে ইতিহাসের সেই চমকপ্রদ অধ্যায়ে বার বার টেনে নিয়ে যেত।

প্রজ্ঞার 'ঘৃত্ত প্রতীক সেই রাজপুত্র রাজকীয় ভোগে ধার তৃপ্তি নেই। সম্পদে মোহ নেই। জরা আর শোক থেকে পরিত্রাণের পথ আবিষ্কার করবার বাসনায় গহন নিশীথে যিনি গৃহত্যাগ করেছিলেন। আমি সেই বুদ্ধেরই পরিচারিকা। বিলাসের ঢেউ যে বাড়িতে সার! দিনরাত আছড়ে পড়ে সেখানে আমি থাকব কেমন করে!

অনেক রাত্তিরে যেদিন আকাশে স্থির ধে"য়ার মত হাক্ক৷ একটা

মি]

রেখা ফুটে উঠবে আর একটা লোকও জেগে থাকবে না কোথাও, গাছের পাতার একটুও শব্দ করবে না, সেদিন মা-বাবাকে কিছু না বলে আমি বুদ্ধের সন্ধানে বেরিয়ে পড়ব

কিন্ত সে কবে?

আমার মা যখন দাঁমী দামী শাড়ি পরে বাড়িতে অতিথিদের অভার্থনা করেন আর বাবা মদের ছোট গেলাসে আস্তে আস্তে চুমুক দেন আর বাড়ির সামনে অনেক বড় বড় গাড়ি দীড়ায়, তখন দিগন্তের একঝলক রঙ হঠাৎ যেন আমার সামনে সেই এক প্রশ্নই পাঠিয়ে দেয়, সে কবে !

মা-র কোল ঘেষে দাঁড়িয়ে কিশোর বয়সে আমি অবুঝ মেয়ের মত ভয়ে ভয়ে অস্পষ্ট প্রশ্ন করতাম, সে কবে ?

আমাকে আদর করে মা হেসে জিজ্ঞেস করতেন, কি কবে রে?

আমি চলে যাব ?

কোথায় যাবি রে?

একদিন রাত্তিরবেল! ওই লেকের কাছে মন্দিরে যেখানে ঢং- ঢং ঘণ্টা বাজে আর অনেক সন্গ্যাসী মন্ত্র পড়ে-আমি সেখানে কবে যব মা?

ম! জোরে জোরে হাসতেন, সাধে তোর নাম শ্রীমতী দিয়েছি | কী সুন্দর নাম!

আমি এখানে থাকব না। একদিন সকালে উঠে তোমরা! আমাকে আর দেখতে পাবে না। কিন্তু মা আমার এঅঁন্তে কখনও কাদবে না

কথা শুনে মা-র মুখে করুণ একটা ছায়া নামত। আমার একটা হাত ধরে তিনি বলতেন, না, কোথাও যাবি না এখন লেখাপড়া করতে হয়-_কোথাও যাবার কথ! ভাবতে হয় না।

আমি চুপ করে থাকতাম। বুঝতাম আমার চলে যাবার কথ! মা-র ভাল লাগছে না। আর আমি তাকে কখনও কিছু বলব না।

যেদিন আমার ইচ্ছে হবে--যেদিন কিছুতেই আমি আর বাঁড়িতে থাকতে পারব না, সেদিন পালিয়ে যাব-_যেখানে ঢং-ং ঘণ্টা বাজে সেখানে

একদিন বিকেলবেলা আয়াকে সঙ্গে নিয়ে মন্দিরে যাবার রাস্তাটা আমি ভাল করে চিনে আসব

ঘর ছাড়ার এমনি ছাড়া-ছাড়া ধেঁয়াটে ভাবনা আস্তে আস্তে আমার কৈশোর পার করে দিল। আর তখন থেকেই মা! বাবা আর আমার মাঝখানে বিরাট অমিলের একটা কঠিন প্রাচীর যেন আপনি গড়ে উঠল

কলেজে ছাড়া আমি কোথাঁও যাই না। আমার কোন বন্ধুও নেই আর সাজ-পোশাকের ভাবনা ভেবে আমি একেবারেই সময় নষ্ট করি না। মা অনেক চেষ্টা করেও সন্ধ্যার কোন পার্টিতে আম্মাকে কখনও নিয়ে যেতে পারেন না। আর তখন তার সঙ্গে আমার কথা-কাটাকাটি হয়।

লোকে কি ভাবে? মা বেশ উষ্ণস্বরে আমাকে বলেন, এমন বিশ্রী শাড়ি পরে তুই বাইরে বার হস-ছি !

আমার পাজতে ভাল লাগেনা মা।

সাজতে তোকে কে বলছে? একটু ভদ্র বেশ করতে দোষ কি। কতরকম লোক আসে না আমাদের বাড়িতে ?

আমি তে! কারুর সামনে যাই না

কেন? এমন হ্যট্িছাড়া স্বভাব তোর হল কেমন করে ?

আমি হেসে বলতাম, জানি না।

কিন্ত এমন করে তোর থাকা চলবে না, আমি বলে দিলাম এবার থেকে আমি জোর করে তোকে আমাদের সঙ্গে পার্টিতে নিয়ে যাব

জোর !

কথা শুনে আমি মনে মনে হাসতাম আমাকে দিয়ে আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কেউ যে কোন কাজ করিয়ে নিতে পারবে না, সে- বিষয়ে আমার একেবারেই সন্দেহ নেই

কিন্তু ঠিক এইসময়--কলেজে ভন্তি হওয়ায় প্রথম প্রথম মা-র সঙ্গে আমার সম্পর্কট! ঈর্ধারই হয়ে উঠল

ঠিক আমাকে সাজাবার জন্যে মা যে খুব বেশি ব্যস্ত হতেন তা নয়, আমি বুঝতে পারতাম আমার বেশ-বাসের ওপর মার্ও প্রসীধনের মাত্রা নির্ভর করছে আমি যদি সাদা সাধারণ শাড়ি পরে এখানে-ওখানে যাই, আর যোগিনীর মত সারাদিন দর্শনের বই-এ ডুবে থাকি, তাহলে যারা আমাদের বাড়িতে ঘন ঘন আসে, সংস্কারমুক্ত অতি আধুনিক মানুষ হলেও তারা অবাক হয়ে মাকে আর আমাকে বারবার দেখে

তাদের সেই দেখার মধ্যে আমার মা বোধহয় প্রচ্ছন্ন বিদ্রপের একটা সুর শুনতে পান। তাই তিনি আমাকে বকেন। আম্মাকে তার মত করে তুলতে চান_যা আমি কোনদিনও হতে পারব না।

আমার ম। কিন্তু লেখিকা

খুব ভোরবেলা পাতলা শিশিরের ঘায়ে খন আমাদের বাগানের ঘাস ভিজে থাকে আর ছুধের গাড়ির রোগা লোকটা খিড়কির দরজার পাঁশে এসে দীড়ায়, তখন নিচ থেকেও দেখা যায় আমার মা দোতলার ঘোরানো বারান্দায় গালে হাত দিয়ে বসে দূরের গাছটার দিকে তাকিয়ে আছেন

আলোর দীপ্তি তখনও প্রখর নয়। বাবা বিছানা ছেড়ে ওঠেন নি। বেয়ার! বাঝুটি রান্নাঘরে সবে জটলা শুর করেছে বেয়ারার প্রথম কাজ হল মা-র পাশের ছোট টি-পয়ে কফির পট আর একটা কাপ পৌছে দেয়৷ মা ইচ্ছেমত কফির কাপে চুমুক দেবেন আর লিখবেন

আমি বাগানে বেড়াতে বেড়াতে মাঝে মাঝে মাথা তুলে মাকে দেখি

আমি ঠিক বুঝতে পারি না, কেন তখন মাকে দেখলে আমার ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা কাপে আমার মনে হয় শা যেমনভাবে সকলের ছোয়! বাঁচিয়ে বসে বসে লেখার কথা ভাবছেন, তেমন ভাবে লেখা যায় না। একটা সীমিত গণ্ডির মধ্যে নিজের দম্ভ বজায় রেখে বসে বসে গাছ-পাখি দেখলেই কি লেখা যায়!

কিন্তু সকালবেলা আমার সময় খুব কম। আমাকে সবই দেখতে হয়--সবই করতে হয় বাবা যতক্ষণ না অফিসে বার হন ততক্ষণ আমি ছায়ার মত তার পাশে পাশে ফিরি। বাবার অফিসে লাঞ্চ পাঠাবার ব্যবস্থা করে তবে আমি কলেজে বার হই।

কখনও কখনও অফিসে যাবার আগে কোন দরকারী জিনিস খুঁজে না পেলে বাবা! আমাকে জিজ্ঞেস করেন, আমার কলমটা কোথায় রে?

আমি তে জানি না বাবা মাকে জিজ্ঞেস করে আসব ?

না না, কথা শুনে আমার বাবা যেন চমকে ওঠেন, ওঁকে এখন বিরক্ত করিস না-_

কিন্ত কেন বিরক্ত করব না ?

আমার কেমন একটা জেদ চেপে যায়। মা এখন সংসারের সব দায় এড়িয়ে যে কাজ করছেন তার কোন মূল্য আমি কিছুতেই দিতে পারি না।

আমি আস্তে আস্তে দোতলার ঘোরানো বারান্দার দিকে এগিয়ে যাই 1! বাবা হয়তো! বুঝতে পারেন না-_বুঝতে পারলে বাধা দিতেন

আমার পায়ের 'খস্‌ খস্‌ শব্দ শুনে মা নিশ্চয়ই বুঝতে পারেন যে আমি বারান্দায় এসেছি কিন্ত তিনি মাথা তোলেন না। কাগজের ওপর ঝুকে পড়ে যেমন লিখছিলেন তেমনি লিখে যান। আমিও চুপচাপ কিছুক্ষণ মা-র দিকে তাকিয়ে থাকি।

বাবার কলমট! দেখেছ মা ?

১১

এখনও তিনি মাথা তোলেন না। তাকিয়ে দেখেন না আমার দিকে

অল্প হাওয়ায় দামী অঞ্িডগুলো ছুলছে। এক ঝলক রোদ এসে পড়েছে মা-র পায়ের কাছে আর থেকে থেকে বড় আমগাছের ডালপালার মাঝ থেকে একটা পাখি ডেকে উঠছে

মা!

এইবার আমার মা মাথা তোলেন। অদ্ভুত শুন্ত দৃষ্টি। যেন তার মনটা এখানে নেই। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন-_ কিন্ত আমাকে দেখছেন না আশ্চর্য, মর এই দৃষ্টি আমার মনের মধ্যে কোন দাগ কাটে না

বাবার দেরি হয়ে যাচ্ছে মা কলমটা কোথায় জান ?

আমার প্রশ্মের উত্তর না দিয়ে মা বলেন, তোকে আমি অনেকবার বারণ করেছি লেখবার সময় আমাকে বিরক্ত না করতে তাহলে কেন তুই সময়ে-অসময়ে এখানে এসে হাজির হস ?

বাবার অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে

আমি কি জানি কেকি কোথায় রেখেছে যা এখান থেকে আর কখনও এরকম করে এখানে আসবি না, বুঝলি ?

আমার মা আবার মাথ! নামিয়ে লেখায় মন দেবার ভান করেন

ভান কথাটা আমি এখানে ইচ্ছে করেই ব্যবহার করলাম। কারণ আমি বিশ্বাস করি ন! উত্তেজনায় দিশাহার! হবার পরমুহ্তেই কোন মানুষ হৃদয়ের একটা স্ুক্ম বৃর্তিকে সঙ্গে সঙ্গে জাগিয়ে তুলতে পারে।

কিন্ত এর পর মা-র সঙ্গে আর আমার কথা বলতে ইচ্ছে করে না। বলবার কিছু নেইও।

ঠিক এই সময়--মানে সকালবেলা আমার মা যখন লেখেন, তখন বাড়ির মধ্যে একটা সাংঘাতিক অঘটন ঘটে গেলেও মা লেখ৷ ছেড়ে নিচে এসে একবারও জিজ্ঞেস করবেন না, কি হল?

টি

কোন মানুষের ছুঃখ-দৈন্য বিপদ-আপদদ কিংবা অভাঁব-অনটনের চেয়ে এসময় মার কাছে লেখা অনেক বড়। আর হয়তে। সেই কারণেই আমি আমার মা-র লেখায় গভীর কোন স্তর আবিষ্কার করতে পারি না। আর আমার মনের কথা মা জানতেন বলেই আমার ওপর একটা বিরূপ ধারণা করে রেখেছিলেন

একেবারেই স্পষ্ট ভাষায় আমাকে কিছু না বললেও মাঝে মাঝে মা-র কথায়-বাতায় আমি বুঝতে পারতাম যে বাবার ওপর তার কোন শ্রদ্ধা নেই

কিন্তু সেটা! মা-র মুখের কথাই

শ্রদ্ধা থাক বা না থাক--এ বাড়ি আর পরিবেশের ওপর তার আকর্ষণ যে অত্যন্ত গভীর সে-কথা তার ভঙ্গিতেই আমার কাছে পরিদার হয়ে উঠত

হঠাৎ কোন-কোনদিন যেদিন ঘন ঘন পাখির ডাক আর কাঁপা- কাপ প্রথম ফাল্গুনের আলোয় আমার মা-র শৌখিন বিলাসী মন ঈষৎ চঞ্চল হয়ে উঠত, সেদিন তিনি আমাকে দেখতেন অনেকক্ষণ

কেন দেখতেন সে-কথা৷ আমি ঠিক বুঝতে পারতাম না। তারপর তিনি ভারী থমথমে গলায় আমাকে কাছে ডাকতেন

মার এই ডাক শুনে আমি শঙ্ষিত হয়ে উঠতাম। তখন হয়তো আমার কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে মা যদি একবার তার নতুন ভাবনার কথা আমাকে থেমে থেমে শোনাতে আরম্ভ করেন তাহলে আর সহজে" থামবেন না। আর তার কথার মাঝে আমার উঠে আসাও চলবে না।

আগেই বলেছি মা-র ভাবনা-চিস্তা আমার মনে ধরত না। তাই তার গল্প-উপন্যাসের প্লট শুনতে আমার কোন কৌতুহল জাগত না।

সেই এক পরিবেশ। একজন বড়লোকের ছেলে আর একজন বড়লোকের মেয়ে কোথাও কোন এক ড্ইংরুমে পাহাড়ে কিন্বা

১৩

সমুদ্রতীরে তাদের আলাপ। তারপর অনেক মান-অভিমাঁনের অধ্যায় পাঁর হয়ে, হয় তাদের বিচ্ছেদ, নয় বিয়ে

যতই পাকা হাতের লেখা হোক না কেন, ঠিক ধরনের কাহিনী পড়তে কোনদিনই আমার ভাল লাগে না। দৈব-ছুবিপাকে যদিও পরিবারে আমার জন্ম হয়েছে, তাহলেও বাড়ির কারুর সঙ্গে আমি কোনদিনও আত্মীয়তার নিবিড় বন্ধন অন্থভব করতে পারি না।

কেন যে পারি না, সেকথা আমি আজকাল অল্প-অল্প বুঝতে পারি, কিন্তু স্পষ্ট করে প্রকাশ করবার ক্ষমতা নেই এমন মনের অবস্থা নিয়ে বেশিদিন সংসারে বাস করা যায়না আমি কি করব-__কোথায় যাব--একটা সঠিক পথের সন্ধান আমাকে তখনও কেউ দিতে পারে নি।

যা হোক, অনেক সময় কাছে ডেকে মা কিন্ত আমাকে নতুন কোন কাহিনী শোনাতেন না তিনি আমাকে দেখতেন আর দেখতে দেখতে নিজের মুখের প্লান ছায়াটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলচ্তেন। আমি বুঝতাম, মা এবার বাড়ির বিরুদ্ধে আমাকে কিছু বলবেন

তুই কি মনে করিস শ্রীমতী, ভিজে-ভিজে উদাস স্বরে ম৷ আমাকে বলতেন, বাড়িতে এমনভাবে থাকতে আমার খুব ভাল লাগে?

খারাপ লাগবে কেন মা?

তাহলে তোর কেন ভাল লাগে না?

এমন সহজ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর আমি মাকে হঠাৎ দিতে পারতাম না। তখন আমি মনে মনে অনেক বেড়ে উঠেছি আসছে বছর আমার কলেজের পড়াও শেষ হয়ে যাবে যদিও আমি খাতায়- কলমে দর্শনের ছাত্রী, তাহলেও অর্থনীতির দিকেই আমার ৰেখকটা বেশি।

মাঝে মাঝে যখন আমি গাড়ি নিয়ে বার হই, তখন লেকের এলোমেলো হাওয়। আর টলমল কালো জল কিংবা ধু ধু ময়দানের

১৪

সবুজ ঘাস আর গঙ্গায় অনেক-সাগর-পেরিয়েআসা বিরাট বিরাট জাহাজের দেয়ালি-আলো! আমার মনে কোন অনুরণন জাগায় না

হয়তো এটা আমার স্বভাবেরই দৌষ। কিন্তুকি করব বলুন? সত্যি কথা গোপন করতে পারব না বলেই তে। কাহিনী লিখতে শুরু করেছি।

যদি কোথাও আত্মঘোষণার সুর কেপে ওঠে, তাহলে ক্ষমা করবেন-_গ্রচ্ছন্ন গর্বের আভা যদি কোন কথায় হঠাৎ ঝলসে ওঠে সে দোষংও আমার নয়। আমি তো আমারই কথা লিখছি দোষ-ক্রটি-অহঙ্কার--এসব তো! তার মধ্যে থাকবেই

আসলে তখন প্রকৃতির অভাবনীয় দৃশ্য দেখবার চোখটাই আমার নষ্ট হয়ে গেছে। কোন অধ্যাপকের কাছ থেকে আমি পাঠ বুঝে নিই নি, কিন্ত আমার স্বতস্ফুর্ত চিন্তা দর্শন আর অর্থনীতি মিলিয়ে সারাদিন আমার মনের মধ্যে অদ্তুত যন্ত্রণার একটা সবুর বাজিয়ে তোল্ছে।

ফুটপাথে বসে থাকা অসংখ্য রোগ! ছেলেমেয়ে, বাচ্চা কোলে নিয়ে ক্লান্ত শীর্ণ কত ম! ছু হাত বাড়িয়ে যেন আমাকে বলে, আমাদের দেখছ না কেন?

ছেলেবেলার একটা দৃশ্য আজও আমার মনে আছে। সেটা বোধহয় শীতকাল আমাকে ই্কুল থেকে তুলে নিয়ে খুব জোরে গাড়ি চালিয়ে ড্রাইভার বাড়ি ফিরছিল। হঠাৎ একসময় গাড়ির গতি কমে এল *

মুখ বাড়িয়ে আমি দেখলাম, এক জায়গায় অনেক ভিড়--আর একটা ছোট ছেলে কোলে নিয়ে এক মা চিৎকার করে কাদছে। তার পাশেই মুখ থুবড়ে পড়ে আছে আর একজন লোক

মামা, আমার কি সর্বনাশ হল গো! আমি কোথায় যাব গো!

ওর কি হয়েছে ড্রাইভার ?

কী জানি, ওর দিকে শুধু একবার তাকিয়ে ড্রাইভার বল, ওরা অমন করে কাদে দিদিমণি

কেন কাদে ওরা ?

ভিক্ষে-টিক্ষে চায় বোধহয় !

কেউ দেয় না?

কেউ কেউ দেয় বইকি

তুমি এখুনি গাড়ি থামাও।

কেন 1

আমি জিজ্ঞেস করব ওর কি হয়েছে।

পাগল নাকি? ড্রাইভার হেসে বলে, অমন কত লোক আছে কলকাতা শহরে

না, তুমি গাড়ি থামাও অত ভিড় কেন !

ড্রাইভার গাড়ি থামিয়ে বলে, মা বকলে আমি কি বলব? যেখানে সেখানে এরকম করে দেরি করলে চলে নাকি দিদিমণি £

হ্যা চলে, আমি প্রায় ছুটে সেই মেয়েটির দিকে এগিয়ে যাই বিরক্ত হয়ে ড্রাইভারও আসে আমার সঙ্গে সঙ্গে

রাস্তার দৃশ্ঠ দেখে সেই প্রথম আমার মনে প্রবল একটা আঘাত লাগে। আজও মনে আছে বাড়ি ফিরে আমি কিছু খাইনি মা! আমাকে খাওয়াতে পারেন নি। বোধহয় সারারাত বিছানায় গড়িয়ে আমি কেঁদেছিলাম

যে মেয়েটি চিৎকার করে কাদছিল, আজ রাস্তায় ভার স্বামী মারা গেছে। অনেক চেষ্টা করেও হাসপাতালে বেচারি জায়গা পায় নি। ছোট ছেলে নিয়ে মেয়েটি কোথায় যাবে? তার যাবার কোন জায়গ! নেই। আর ছেলের বাবাকে শ্বাশানে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করবে কে? তাদের যে চেনাশোনা কেউ নেই ! তাই অমন করে মেয়েটি কাদছে। কাদছে আর পেট ঝোলা রোগ ছেলেটাকে বুকে চেপে ধরছে।

১৬

আমার মুখে কথা নেই। আমার বুক ঠেলে কান্না আসছিল ড্রাইভার যদি সেদিন জোর করে আমাকে গাড়িতে না তুলত, তাহলে হয়তো আমি অন্তান হয়ে রাস্তায় পড়ে যেতাম। সেই অল্প বয়সে বারবার আমার মনে শুধু একটাই প্রশ্ন জাগত, কেন এমন হয় ? আমি ওদের জন্তে কিছু করতে পারি না কেন !

তারপর এমন অনেক দৃশ্য অনেকবার দেখেছি কেঁদেছি আর আস্তে আস্তে মা-বাবার ওপর নিশ্চিন্ত হয়ে নির্ভর করবার বিশ্বাস আমার কমে গেছে ওঁদের আমার বড় বেশি নিষ্ঠুর বলে মনে হত। কিন্তু ভাষা! সাজিয়ে কোন কথাই ওদের বলবার সাহস হত না, আর কি বলব সে কথাও হঠাৎ ভেবে পেতাম না।

সেই বয়সে আমি তাদের কেমন করে বলব যে, তোমাদের আছে অসংখ্য ঘর--আর অনেকের ঘরই নেই। তোমাদের আছে প্রচুর খাবার--আর অনেকের আছে শুধু ক্ষুধা তোমাদের কত রকম কাপড়ের স্ূপ--আর কত লোক শীতে কাপে।

আমি তোমাদের কেউ নই। নিষ্ঠুরতার প্রতিমূতির মত তোমরা আমাকে দূরে সরিয়ে রেখেছ তোমাদের অনুভূতি ৰড় স্ুল। তোমরা নিজেদের ছাড়া আর কারুর কথাই ভাব না। আমি তোমাদের আমার আপনার লোক ভাবব কেমন করে।

কিন্ত মাকে ধরনের কোন কথাই আমি বলতে পারতাম না বলতে ইচ্ছেও করত না। কারণ, শুধু কথায় রূঢ় আঘাত দ্বিয়ে কোন লাভ নেই। যেন ভবিষ্যতে আমি আমার কাজের মধ্যে দিয়ে মা-র প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি

আমাকে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকতে দেখে যেন আপন মনেই মা আবার বলতেন, অনেক সময় এখানে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যায়। মনে হয়, লতাপাতা ঘেরা কোন নির্জন কুটিরের ছায়ায় ঝাঁপিয়ে পড়ি-যেখানে কেউ আমাকে চিনবে না-_জানবে না। সকলকে ছেড়ে আমি একেবারে একা থাকব-__-

১৭

প্রীমতী--২

কিছু একটা বলতে হবে বলেই আমি বলতাম, একা থাকতে চাও কেন মা?

এক! থাকতে না পারলে শাস্তিতে লেখ! যায় না রে, হয়তো! আমার মা অকারণেই একটু হাসতেন, এখানে অনেক কাজ, অনেক নিয়ম-কান্ুন_-এখানে কি সারাদিন লেখা যায় !

তারপর এক সুরে আমাকে ম! নিজের কথাই শোনাতেন, এমন করে বেঁচে থাকতে আমি চাই না রে। অভাবের মধ্যে বাস করে আমি নিজেকে চিনতে চাই। ছেলেবেলায় আমি ঠিক তোর মত ছিলাম। তাই তুই বোধহয় আমারই স্বভাব পেয়েছিস। কাপে কফি ঢালতে ঢালতে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করতেন, খাবি নাকি একটু ?

না!

আজ তোর ক্লাস নেই ?

সাড়ে এগারোট। থেকে !

কফির কাপে মাঝে মাঝে চুমুক দিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই মা ছু-এক পাতা লিখতেন। এক-একবার মাথা তুলে দেখতেন আমাকে আমি উঠে যেতে চাইলেই বাধা দিয়ে বলতেন, বস।

মা আমার সঙ্গে কথা বলুন বা ন! বলুন, আমাকে বসে থাকতেই হবে। আমি চলে যেতে চাইলেই তিনি অসন্তষ্ট হবেন। মনে করবেন, আমি তাকে অবহেলা করছি।

এখন পাখির ডাক শোনা যায় না একটু একটু গরম লাগছে কাছাকাছি কোথাও ঘড়ি নেই। আমি বুঝতে পারছি না এখন কণ্টা বেজেছে। বাবাকে অফিসে পৌছে দিয়ে বড় গাড়িটা ফিরে এল। মা এখন ওই গাড়ি নিয়ে মার্কেটে যাবেন কি না কে জানে। খুব বেশি দেরি হয়ে না গেলে আমি বাসেই কলেজ যাই

১৮

নিয়েও মার কাছ থেকে আমাকে অনেক কথা শুনতে হয়।

অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখে মা তার গোপন ছুঃখ আমাকে জানাবার চেষ্টা করতেন তার প্রতিভার ষথার্থ ক্ষুরণ বাড়িতে হল নাঁ_ সেটাই তাঁর সবচেয়ে বড় ছুঃখ। যদি আমার বাবার মত মানুষের সঙ্গে তার বিয়ে না হত, তাহলে নাকি জীবনটা তিনি একেবারেই অন্যরকম ভাবে গড়ে তুলতে পারতেন

একটু ইতস্তত করে বাবার পক্ষ টেনে আমি বলতাম, কিন্তু তোমার কোন কাজে বাবা তো কখনও বাধা দেন না মা।

না, কফির খালি কাপটা সরিয়ে দিয়ে মা বলতেন, বাঁধা যেমন দেন না, তেমনি কোন উৎসাহ দেবার ক্ষমতাও তার নেই

ইচ্ছে না থাকলেও আমাকে বলতে হত, কিন্ত হাজার অস্তুবিধা হলেও তিনি কখনও তোমাকে বিরক্ত করেন না

ছুই ঠোটের ফাঁকে কলমট! একটু ছু“ইয়ে মা! বলতেন, শুধু নির্জনত। পেলেই জীবনকে মনের মত করে গড়ে তোলা যায় না। উৎসাহ দেয়া মানে কি? একটা পরিবেশ গ্ষ্ি করে প্রতিভাকে বাঁচিয়ে রাঁখা--এ-সংসারে যেমনভাবে দিন কাটাতে হয়, তেমন অবস্থায় আমার পক্ষে বেশি দূর এগিয়ে যাওয়া খুবই শক্ত

তুমি কিচাও মা?

আমি কি চাই? মা আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসতেন, সে-কথ! আজ বলে আর লাভ কি, তিনি থামতেন। বিষগ্ন দৃষ্টিতে এদিক-ওদিক তাকাতেন, তবে আমি কি চেয়েছিলাম জানিস?

কি?

বাড়িতে যা আছে আমি তার কিছুই চাই নি। এই আসবাব- আড়ম্বর, এমন বাড়ি আর বাগান, প্রত্যহের জখক-জমক কোনদিন আমার মনকে টানে নি

হিম-হিম ভিজে সকালের ঠাণ্ডা আলোয় এমন কথা শোবার সময় প্রথম প্রথম মার ওপর আমার গভীর সমবেদনা জাগত। তার মধ্যে আমি যেন নিজেকে অনুভব করতে পারতাম

কিন্তু কথার ফাকে ফাকে মা বাবাকে এই প্রতিকূল পরিবেশের জন্য যখন দায়ী করতেন, তখন তার কথায় আমি ঠিক সায় দিতে পারতাম না। এমন অবস্থায় বাস করবার জন্যে হয়ত বাব! এক দায়ী নন। কিন্তু কারা যে দায়ী, সে-কথা তখন বোঝবার মত বুদ্ধি আমার ছিল না

এমন ভাবে আমি বাঁচতে চাই না, আমি কোন কথা না বললেও মা বলে যেতেন, তোর বাব। যেমন করে বেঁচে আছেন, সে বাঁচার সার্থকতা কোথায়! কেজানে তার নাম তাকে শ্রদ্ধাই বা করে কে। লোকে কাজের জন্ত তার কাছে আসে, আর কাজ শেষ হলেই চলে যায়। একদিন যখন তার ওই অফিসে কাজের মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে, তখন রাতারাতি নতুন লোক এসে বসবে তার জায়গায় ভবিষ্যতে কে জানবে তার নাম !

অনেকের নামই তো! লোকে জানে না, আমি উঠে দীড়িয়ে বলতাম, নামের মোহ না থাকাই ভাল

তা না হয় না থাক, কিন্ত কাজের মোহ না থাকলে চলবে কেন? যারা তোর বাবার মত কাজ করে, তাদের ওপর কখনও আমার কোন শ্রদ্ধা ছিল না। এজীবন আমি চাইনি-_চাইনি--চাইনি |

বেতের টেবিলের ওপর ছুই হাত মুড়ে আমার ম! যেন ভেঙে পড়তেন। কেন তার অস্বাভাবিক কানা যে ষে জিনিস আমাদের বাড়িতে আছে, তার একটা না হলে মা-র যে সাংঘাতিক রকম অস্ুবিধা হবে, সে-কথা তার চলাফেরা দেখেই আমি বুঝতে পারতাম

সকালবেলা আমার যে মা এমন করে কাদতেন, কলেজ থেকে ফিরে বিকেলের চাপা আলোয় এর ননীটিছ্হঠাৎ আমি তাকে

চি্ধতে পারতাম না তখন আমি ভাকিয়ে থাকতাম ভার দিকে-” অনেকক্ষণ।

বয়সটা যেন হঠাৎ অনেক কমে গেছে মা-র। ঠোঁটে মুখে আর ভুরুতে দামী রঙের ছ্াপ। চুলের বিষ্যা করতেও অনেক সময় লেগেছে পাতলা রঙীন একটা শাড়ি তার শরীরটাকে টান-টান করে তুলেছে আয়নার সামনে নিজেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে মা বারবার দেখছেন। হাসি গোপন করবার জন্য আমি অন্যদিকে মুখ ফেরাতাম

শ্রীমতী, যেন ভয়ে ভয়ে বলতেন আমার মা, একটা কথা শুনবি ?

আমি জানতাম মা কি বলবেন। তবু অন্যদিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করতাম, কি?

আজ আমাদের সঙ্গে ডরইংরুমে থাকবি তুই-?

না

কেন?

আমি দৃঢ়স্বরে বলতাম, কতবার তো৷ বলেছি মা, আমার ভাল লাগে না।

আহা, আমারই কি ভাল লাগে? কিন্তু তোর বাবার জন্য আমাকে যে থাকতেই হয়--আর আমার জন্যে তুই না হয় রইলি__

সকালের* প্রথম আলোয় ঘোরানো বারান্দায় একরাশ সাদা কাগজ সামনে নিয়ে যে মাকে আমি বসে থাকতে দেখেছি--আমার সেই মা-র সঙ্গে এই মার তফাৎ অনেক ইনি যেন একেবারেই অন্যরকম। আর একজন কেউ। আমি কার ওপর বিশ্বাস রাখব !

আমি কেমন করে বিশ্বাস করব যে, সাহিত্যের জন্যে বাড়ির সব আরাম ছেড়ে বিকট দারিজ্রযের মাঝে তিনি হাসিমুখে দিন

২১

কাটাতে পারেন। যদি আমার মা-র অসাধারণ ব্যক্তিত্ব থাকত, তাহলে এখানে থেকেই তিনি হয়তো সহজেই তার প্রতিদিনের জীবনপধারাকে একেবারে অন্থরকম করে তুলতে পারতেন

তৈরি হয়ে নে। সকলের আসবার সময় হল-_-

না ম।, আমার পড়াশুনো আছে।

একদিন লেখাপড়া না করলে কোন ক্ষতি হবে না তোর, মুখে আর একবার পাউডারের পাফ বুলিয়ে মা বলতেন, পরীক্ষার তো এখনও অনেক দেরি আছে

রল্ষত্বরে আমি বলতাম, পার্টিতে বসে বসে সময় নষ্ট করতে আমার ভাল লাগে না মা-কেন তুমি বারবার আমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে কাজ করতে বল? মাকে এডাবার জন্যে কথা শেষ করেই সে ঘর থেকে আমি সরে যেতাম

আর যেতে যেতে শুনতে পেতাম বিরক্তির তীব্র স্বর মা-র মুখ থেকে বেরিয়ে আসত, আশ্চর্য! এমন অস্ত্ুত জেদী মেয়ে বোধহয় আর কোথাও নেই

এই প্রথম নয়, মা আমার সম্বন্ধে এমন উক্তি বুবার করেছেন আর একট কথা আমি কেমন করে আন্দাজে বুঝতে পারি যে, তিনি যতই আমার স্বভাব পরিবরনের চেষ্টা করুন- কোন ফল যে হবে না, সে-কথা তিনি বুঝতে পেরেছেন

তাই আমার ওপৰ তার ঈর্ধাব ভাবটাও প্রবল হয়ে উদেছে। সত্যি-মিথা। জানি না, হয়তো বয়সের একটা স্বাভাবিক সঙ্ষোচ আছে বলে তিনি মাঝে মাঝে আমাকে তার নিরাসন্ম মনের কাহিনী শোনান |

কিন্ত এমন সন্ধোবেলায় আমার জন্য নষ্ট করবার মত বেশি সময় মার থাকে না। তিনি একটু বেশিমাত্রায় ব্যস্ত হয়ে গুঠেন। বারবার রান্নাঘরে যান। কথায় কথায় বেয়ারা-বাবুচিকে ডাকাডাকি করেন। বস্বার ঘরটা ঢেলে নতুন করে সাজান

২২

আর বাবা ফিরে এলেই গর্বের হাসি-হাসি মুখ করে তাকে জিজ্ঞেস করেনঃ কেমন হয়েছে ?

চমৎকার, বাবা হাতের কাছের ছোট ছাইদানে সিগারেটের ছাই ঝেড়ে বলেন, তুমি একটু ছু'লেই সব কিছুর চেহারা একেবারে অন্থরকম হয়ে ষায়।

তাই নাকি? আমার মা মুখ ফিরিয়ে হাসেন, তুমি কিন্তু ঠিক এক রকমই রয়ে গেলে

কে বলে সে-কথা, বাবাও হাসেন মা-র একটু কাছে এগিয়ে এসে, এই দেখ না, একটু আগে কাইরে একেবারে অগ্রকম ছিলাম, কিন্তু এখন-_

থাক থাক, ওপরে তাকিয়ে কয়েক মুহুতের জন্তে কি যেন ভাবেন আমার মা, মেয়েটার এবার একটু চিকিৎসার ব্যবস্থা কর।

বাবা চমকে ওঠেন, কি হল ওর ?

কি জানি, স্বরে বিরক্তি মিশিয়ে মা বলেন, কেমন অদ্কুত ধরনের অস্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে কারুর সঙ্গে মেশে না কোথাও যেতে চায় না। এই বয়সে এমন করে দিন কাটানো কি ভাল?

কোন বন্ধু-বান্ধব নেই ওর ?

মনে তো হয় না।

তাহলে ভাবনার কথা বটে, হাতের সিগারেট নিভিয়ে ফেলেন বাবা, চল, ওকে*নিয়ে বাইরে কোথাও ঘুরে আসি

কতবার তো গেলাম কত জায়গায় কিহল?

তাহলে কি করা যায়, মা-র কথা শুনে বাবাকেও হঠাৎ যেন আমার ভাবনা পেয়ে বসে, ওর অনেকের সঙ্গে মেশা দরকার-_ অনেক মানুষ দেখা দরকার--

সে-কথ! একবার ওকে বলে দেখ না

বলব

আমার মা-বাবার মধ্যে প্রায়ই আমাকে নিয়ে অনেক কথা হত। মাঝে মাঝে তাদের কথাবাতার টুকরো আমার কানে আসত, আর কখনও কখনও তারাই আমাকে আমার সন্বন্ধে তাদের অভিযোগের কথা জানাতেন। কিন্তু শেষের দিকে আমি বুঝতে পারতাম, মা যেন আমাকে একটু ভয়ও করতেন

আর কথায় কথায় বারবার আমাকে বোঝাতেন যে, আমি যেমন করে লেখাপড়া আর নিজের স্বাধীন ভাবনা নিয়ে দিন কাটাই, তেমন করে দিন কাটাবার ইচ্ছে তার নাকি ছোটবেলা থেকেই তাহলে কেন তিনি আমাকে তাদের সান্ধ্য-আসরে নিয়ে যাবার জন্যে জোর করেন, আমি শুধু সে-কথাটা কিছুতেই বুঝতে পারি না

আমার ভাল লাগে না। বিকট একটা যন্ত্রণায় আমি ছটফট করি। প্রতি পদে হালকা লৌকিকতার চমক, জীবনকে সুলভ করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা আর নির্লজ্জ অপচয়েয় বূঢ় প্রকাশ আমাকে নিবিড় বেদনা দেয় আমার মা-বাবার ওপর আমি শ্রদ্ধা হারাই

পার্ট শেষ হয়ে যাবার পর যখন তারা আমার সামনে চলাফেরা করেন আর আমি তাদের শরীর থেকে বিলিতি মদের গন্ধ পাই, তখন--আপনাদের সত্যি বলতে বাধা নেই--এ পরিবারে আমার জন্ম হয়েছিল বলে একটা অদ্ভুত অনুভূতি আমার শরীরে দ্বণার শিহরণ তোলে

এই অশুচি পরিবেশে অন্ধের মত কিন্বা শিকল বাঁধ! মৃূক এক জীবের মত আর কতদিন আমাকে কাটাতে হবে !

কবে মুক্তির বিপুল তরঙ্গ এসে এদের কবল থেকে আমাকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে !

এখন আমি শুধু দিন গুনি। এখান থেকে আমার বিদায়ের দিন। এই নিষ্টুর স্বার্থপর পরিবেশ থেকে আমার মুক্তির দিন। হঠাৎ

একদিন দূর থেকে থেমে থেমে ভেসে আসা বঙ্কারের মত নিবিড় একটা ইঙ্গিত আমাকে আশ্বাস দেবে-সাহস দেবে আর তখন এখানকার কোন কিছুই আমাকে টেনে রাখতে পারবে না আমি গোপন ছায়ার মত সেই ইঙ্গিতের নির্দেশে এই নির্দয় পরিবেশ ছেড়ে এক মুহুে সরে যাব।

কিন্ত আজ আমার মনে প্রশ্ন জাগে, কোথায় যাব? কে আমাকে ডাকবে? কে এগিয়ে আসবে আমার মনের কাছে-- যে না বলতেই আমার এতদিনে তিল তিল করে জমে ওঠা সব যন্ত্রণা অসহ নতুন এক উদ্দীপনার ছটায় ঢেকে দেবে |

আমি তাকে চিনি তার প্রতীক্ষা করি। কিন্তু জানি না তার নাম। তবু সে আসবে আসবেই ঢেউএর মত। ঝড়ের মত। সু্যমুখীর মত হঠাৎ একদিন সে ফুটে উঠবে আমার জীবনে

শৈশ্বব আর প্রথম কৈশোরের সে বাসনা আজ আমার ঘুচে গেছে আক্তও আমি বুদ্ধ মন্দিরের ঢং টং বাজনা শুনি, আর আমার মন অনেক- অনেক দুরে ভেসে যায়। কিন্তু আমি আজ মন্দিরে আশ্রয় নিতে চাই না-বাইরের একটা! আশ্চর্ধ কাজের মধ্যে ডুবে যেতে চাই

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে দেখছি আবছায়া একটা আক্রোশ--স্পষ্ট চেতনার একটা রেখা আন্তে আন্তে আমার মনে গভীর হয়ে উঠছে। যখন আমার*কাছাকাছি অসংখ্য শীর্ণ মানুষ ক্ষুধায় ছটফট করছে, দুখের বিপুল ভারে দেহ যাদের বেঁকে যাচ্ছে-তখন আমারই চোখের সামনে যদি দেখি অকারণ উৎসবে দিনের পর দিন একদল মানুষ শুধু সব কিছুর অপচয় করে যাচ্ছে, তাহলে তাদের হৃদয়হীন ছাড়া আমি আর কি আখ্য! দিতে পারি !

আমার মা-বাবা! যেন অন্যের অন্ন কেড়ে খাচ্ছেন নিজেদের স্বার্থপরতার জন্যে চারপাশে তারাই অভাবের কগিন জালটা তিলে

তিলে প্রসারিত করে চলেছেন তাই আমার মা-বাবার বিরুদ্ধে মনে মনে আমি সারা জীবনের এক সংগ্রাম ঘোষণা করি।

আমার কাজ বাইরে-মন্দিরের ভেতর নয়। এখান থেকে আমি চলে যাব অন্য আর এক পরিবেশে, যেখানে স্বার্থপরতার এমন বীভৎস প্রকাশ নেই এমন কোন ঘরেই আমি যাব, যেখানে দেয়ালে-দেয়ালে নিবিড় মমত্ববোধের স্পর্শ লেগে আছে

আর এমন কোন কেউ--যাকে আমি অনুভব করি আমার বুকজোড়া যদ্বণার মাঝেও সে থাকবে আমার সংগ্রামের অক্রাস্ত সঙ্গী হয়ে। কিন্ত তাকে আমি কোথায় পাব? এমন জায়গায় সেআসে না-আসতে পারে না। তার গতিবিধি অন্য কোথাও সেখানকার ঠিকানা আমি আজও পাই নি।

তবু আজ থেকে আমি তাকে খুঁজে ফিরব এই প্রতিকূল পরিবেশে বাস করেও আমার প্রথম কাজ সেই হদয়বান মানুষের অনুসন্ধান। আমার সমস্ত ইন্দ্রিয় হঠাৎ যেন সজাগ হয়ে ওঠে। এই ভাবনার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের বড় বড় গাছের ফাক থেকে অনেক পাখি ডেকে ওঠে পাতার মৃদু মর্মরও আমি শুনতে পাই। আর ঠিক সেই মুহুর্তে আলোর সরু রেখা আমার মুখের ওপর এসে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে থাকে

১৪৬

তিন

মা-বাবা আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আমার বিষষন দৃষ্টি, শ্রথ গতি আর কোলাহল-বিষুখতা৷ বন্ধনের স্বাদ পেলেই দূর হয়ে যাবে--এই ধারণায় ছারা স্থির করলেন আমার বিয়ের ব্যবস্থা করা৷ দরকার। আর এতদিন কেন সে-চেষ্টা করেন নি--সে-কথা ভেবে অনুতাপ করলেন

আগেই বলেছি উগ্র আলোকরেখায় আমাদের বাড়ি উজ্জল আর আমার ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধের কোন বাধা নেই-_-আশা করি সেকথা না বললেও চলে মা-বাবা নিজেদের নিয়ে সব সময় এত বেশি ব্যস্ত যে, আমি কখন কি করলাম--কোথায় গেলাম- তা নিয়ে ভারা কোন কৌতুহল দেখাবেন না।

কিন্ত এবার আমার একজন সঙ্গীর সন্ধানে মা রীতিমত ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আর সে কি রকম হবে, তার বিশদ আলোচন৷ আমার সামনেই মা-বাবার মধ্যে হত। আমি এই ফাকে তাদের কাটা-কাটা সংলাপের কিছু কিছু আপনাদের শোনাই মাঝে মাঝে কঠিন উত্তেজনার চাপে তাদেব কথার মাঝে আমার বলে উঠতে ইচ্ছে করত, না না না, এমন কাউকে আমি চাই না।

সবে বিলেত থেকে ফিরেছে এস ব্যানাজির ছেলে--পাইপ দাতে চেপে বাবা ঝলতেন, তৃমি মিসেস ব্যানাজির সঙ্গে একদিন কথা বলে দেখ না

কথায় ঝখজ ছিটিয়ে মা বাধা দিতেন, এস ব্যানাজির ছেলে মানে? তুমি ওই অজিতের কথা বলছ?

হ্যা হ্যা

ছি ছি, তোমার মেয়েকে খাওয়াবে কি? এত বছর বিলেতে কাটিয়ে একটা চারশ টাকা মাইনের চাকরি জুটিয়ে ভারী বাহাছুরী

করেছে, তীক্ষত্বরে বিশেষণ প্রয়োগ করে মা বলতেন, ওয়ার্থলেস ফেলো!

বোকা-বোকা দৃষ্টিতে মা-র মুখের দিকে বাবা তাকাতেন, তুমি কারুর কথা ভেবেছ নাকি ?

ডাক্তার রায়ের ভাইপো-_

বলব নাকি ভাক্তার রায়কে ?

ডোন্ট বিসিলি! বাবার মতামতের যেন কোন দামই নেই, বুড়োদের এর মধ্যে টানবার দরকার কি! ছেলেকে একদিন সন্ধ্যেবেলা ডাকলেই তো হয়।

কি নাম যেন ছেলের ?

কল্যাণাক্ষ।

হ্যা হ্থ্যা, ফাইন বয়, অনেকক্ষণ চুপ করে বাবা পাইপ টানতেন, কিন্ত খুকি শেষ অবধি গোলমাল না করে !

কিসের গোলমাল ?

যদি সামনে না আসে? মানে, ইফ সি ডাজন্ট লাইক হিম ?

কি বোঝে লাইকিং-ডিসলাইকিং-এর ? এমনভাবে আর বেশিদিন থাকলে মেয়েটা পাগল হয়ে যাবে, তা কিন্তু আমি তোমায় অনেকদিন আগে থেকেই বলে আসছি এদিক-ওদিক তাকিয়ে মা গলা নামিয়ে বলতেন, আর, সি ইজ নট আযাট-অল চামিং--এত চেষ্ট। করেও ওকে আযাকমগ্রিসড্‌ করতে পারলাম না। কল্যাণাক্ষ ওকে এড়িয়ে যায় কিনা আগে তাই দেখ।

তা হয় তো যাবে না, আমাকে টেনেই বাবা কথা বলতেন, খুকি যা রেজাণ্ট করেছে পরীক্ষায়-_

মা মুখ টিপে হাসতেন, ওসবের দাম ছেলেরা দেয় নাকি কখনও ?

দেয় না? যতই রূপ থাক, আজকাল লেখাপড়া না-জানা মেয়ে এসব ছেলেরা ঘরে আনতে চায় নাকি ?

রূপ আর বিষ্ভা--তারা দুই-ই চায় তোমার মেয়ের রডের কথাটা তুলে যেও না।

হাউএভার, বাবা বোধহয় একটু হাসতেন, এখন বিয়ের বাপারটা কি ভাবে নেয় সেটাই তো বুঝতে পারছি না

তোমাকে কিছু বুঝতে হবে না, এক মিনিট থেমে মা বলডেন, যা বোঝাঁবার ওকে, আমিই বোঝাব

দ্যা আই নো

আলোচনার এখানেই শেষ হত না। আরও অনেক ছেলের কথা তারা তুলতেন। আমি যেমন পরিবারে জন্মেছি ঠিক তেমন অসংখা পরিবারের উল্লেখ করে বিশ্লেষণ করতে বসতেন, সবচেয়ে বেশি উপার্জন কার এবং প্রয়োজন হলে কাকে বড় চাকরি জুটিয়ে দিয়ে বাবা আমার জন্তে তাকে কৌশলে বেঁধে ফেলতে পারবেন কি-না

আমার বিয়ের ব্যাপারে তাঁদের এমন চুলচেরা হিসেব-নিকেশ করতে দেখে বিদ্রপের একটা উদ্দাম তরঙ্গ আমার মনের মধ্যে ফেনিয়ে উঠত। মাকে আমার জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করত, কেন তুমি বারবার আমার কাছে নিজেকে ছোট প্রমাণ কর ! কেন বল যে; এই স্ুখ-সম্পদ ছেড়ে শুধু তোমার সাহিত্য সম্বল করে অনিশ্চিতের মাঝে ঝাপ দিতে চাও।

তোম$দের সঙ্গে আমার কোন মিল নেই। তোমরা যাকে আনবে-_আমার চরিত্রে সে ক্গীণ আলোর আচও লাগাতে পারবে না--আমার কোন পরিবর্তনই হবে না, সে-কথা যদি এখনও না বুঝে থাঁক, তাহলে যেদিন কল্যাণাক্ষকে তোমরা স্বার্থসিদ্ধির জন্যে কৌশলে আমন্্ণ করে নিয়ে আসবে, সেইদিন নিশ্চয়ই বুঝতে পারবে

কিন্তু শেষ অবধি কল্যাণাক্ষের সঙ্গে আমার দেখা হল না। হঠাৎ একদিন যাকে যত্ব করে নিয়ে আসা হল তার নাম বিজয়কেতন আ-বাবা যদিও আমাকে কিছু বলেন নি, কিন্ত আমি বুঝতে পারলাম

হন

যে, এর আয় আর সামাজিক পদমর্ধাদ তাদের দৃহিতে হয়তো সেই কল্যাণাক্ষের চেয়ে আরও অনেক বেশি আজকাল বাড়ির মানুষের চলাফেরার মধ্যে আমি খুব সহজেই একটা অর্থ খুঁজে পাই।

একেবারে প্রথমেই আসল কথাটা মা কিন্ত আমার কাছে ভাঙলেন না। আমাকে কাছে ডেকে একথা-ওকথার পর বললেন, বিজয় কাল আসবে কিছুদিন হল আমেরিকা থেকে ফিরেছে খুব বড় এঞ্জিনিয়ার--

আর একটা বাড়ি করছ নাকি মা? এঞ্জিনিয়ারের নাম শুনে সরল প্রশ্ন বেরিয়ে এল আমার মুখ থেকে

বাড়ি? কই নাতো!

তাহলে হঠাৎ এঞ্জিনিয়ার কেন?

মা হেসে উঠলেন, এমনি আসবে তোর বাবার বন্ধুর ছেলে কিনা ওকে খেতে বলেছি কাল।

আমি আস্তে বলি, |

তোকে কাল সারাদিন বাড়ি থাকতে হবে, হাতের কলমটা ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখতে দেখতে মা বলেন, এবার তো৷ আর পার্টি-টার্টি নয়, বিজয় একাই আসবে--

কখন?

সন্ধ্যেবেলা আর, অন্ন হেসে মা বলেন, রাগ-রাগ মুখ করে এক কোণায় গম্ভীর হয়ে বসে থাকবি না। হাসরি। কথা বলবি |

আমি এক কথায় রাজি হয়ে যাই, হ্যা

মা খুশি হয়ে বলেন, প্রায় তোরই সমবয়সী কিনা আমাদের সঙ্গে বেশিক্ষণ আর কি কথ৷ বলবে !

তুমি ওকে দেখেছ ম! ?

আমার প্রশ্মের উত্তর না দিয়ে মা বললেন, খুব চমৎকার ছেলে বিজয় ওর বাবার তিনটে